পরিমাপ- ক্লাস ৯ প্রশ্ন উত্তর | Measure Class 9 Question Answer

পরিমাপ- ক্লাস ৯ প্রশ্ন উত্তর 

Measure Class 9 Question Answer

 1. ভৌত রাশি কাকে বলে? কয়েকটি ভৌত রাশির উদাহরণ দাও?

উত্তরঃ যে সমস্ত প্রাকৃতিক বিষয়কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিমাপ করা যায় তাদের ভৌত রাশি বলা হয়। 

উদাহরণ: দৈর্ঘ্য, ভর, উন্নতা, কার্য, সরণ, বেগ, স্মরণ, বল প্রভৃতি হল ভৌত রাশি।

2. সমস্ত প্রাকৃতিক বিষয়কে কি ভৌত রাশি বলা যায়—উদাহরণ সহযোগে ব্যাখ্যা করো?

উত্তরঃ আমরা বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয় দেখি বা অনুভব করি। কিন্তু এদের মধ্যে সবকটি পরিমাপযোগ্য নয়। যেমন- দয়া, স্নেহ, রাগ প্রভৃতি। যেহেতু এই সমস্ত প্রাকৃতিক বিষয় পরিমাপযোগ্য নয়, তাই এদের ভৌত রাশি বলা হয় না। আবার দৈর্ঘ্য, ভর, সময় প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিষয় পরিমাপযোগ্য, তাই এদের ভৌত রাশি বলা হয়। সুতরাং, সমস্ত প্রাকৃতিক বিষয়কে ভৌত রাশি বলা যায় না।

3. স্কেলার রাশি কাকে বলে? কয়েকটি স্কেলার রাশির উদাহরণ দাও ?

উত্তরঃ যে সমস্ত ভৌত রাশির শুধুমাত্র মান আছে কিন্তু অভিমুখ নেই তাদের স্কেলার রাশি বলা হয়।

 উদাহরণ: দৈর্ঘ্য, ভর, উন্নতা, কার্য প্রভৃতি হল স্কেলার রাশি।

4. ভেক্টর রাশি কাকে বলে? উদাহরণ দাও?

উত্তরঃ যে সমস্ত ভৌত রাশির মান ও অভিমুখ দুই ই আছে এবং যাদের যোগ ভেক্টর যোগের নিয়মানুযায়ী হয়, তাদের ভেক্টর রাশি বলা হয়।

 উদাহরণ; সরণ, বেগ, ত্বরণ, বল প্রভৃতি হল ভেক্টর রাশি।

5. স্কেলার ও ভেক্টর রাশির মধ্যে পার্থক্য লেখো?

উত্তরঃ  স্কেলার ও ভেক্টর রাশির মধ্যে পার্থক্য হল-

স্কেলার

ভেক্টর

1.
স্কেলার রাশির শুধুমাত্র মান আছে, অভিমুখ
নেই।

1.
ভেক্টর রাশির মান ও অভিমুখ দুই-ই আছে।

2.
সমজাতীয়
স্কেলার রাশির যোগ, সাধারণ বীজগাণিতিক নিয়মানুযায়ী হয়।

 

2.
সমজাতীয়
ভেক্টর রাশির যোগ, সাধারণ বীজগাণিতিক নিয়মানুযায়ী হয়  না।

3.
দুইটি স্কেলার রাশির গুণফল সর্বদা একটি স্কেলার
রাশি হয়।

 

3.
দুইটি ভেক্টর রাশির গুণফল একটি স্কেলার অথবা
ভেক্টর রাশি হতে পারে।

6. কোনো ভৌত রাশির মান ও অভিমুখ থাকলেই কি তাকে ভেক্টর রাশি বলা হয় ? 

অথবা, তড়িৎপ্রবাহের মান ও অভিমুখ দুই-ই আছে, কিন্তু তড়িৎপ্রবাহমাত্রা স্কেলার রাশি কেন?

উত্তরঃ  কোনো ভৌত রাশির মান ও অভিমুখ থাকলেই যে তাকে ভেক্টর রাশি বলা যাবে, তা নয়। 

যেমন—তড়িৎপ্রবাহ। তড়িৎপ্রবাহের মান ও অভিমুখ দুই-ই আছে, কিন্তু তড়িৎপ্রবাহের যোগ ভেক্টর যোগের নিয়মানুযায়ী হয় না। তাই তড়িৎপ্রবাহ ভেক্টর রাশি নয়, এটি স্কেলার রাশি।

7. ‘1’ kg পরিমাণ আলুর বাজারদর 20 টাকা’— এই বাক্যে আলু, আলুর পরিমাণ, এদের মধ্যে কোনটি ভৌত রাশি, কোনটিই বা নয়—কেন তা বুঝিয়ে লেখো।

উত্তরঃ  বাক্যটিতে আলুর ভর 1 kg, অর্থাৎ এটি পরিমাপযোগ্য রাশি। তাই আলুর ভর হল একটি ভৌত রাশি । আলু একটি পদার্থ, যা পরিমাপযোগ্য নয়। তাই এটি ভৌত রাশি নয়।

8. নিম্নলিখিত রাশিগুলির মধ্যে কোনটি স্কেলার ও কোটি ভেক্টর তা উল্লেখ করো : দৈর্ঘ্য, সময়, ভর, ওজন, বল, দ্রুতি, বেগ, ত্বরণ, ভরবেগ, কার্য, ক্ষমতা, চাপ, সরণ, কম্পাঙ্ক, ঘনত্ব।

উত্তরঃ  স্কেলার রাশি: দৈর্ঘ্য, সময়, ভর, দ্রুতি, কার্য, ক্ষমতা, চাপ, কম্পাঙ্ক, ঘনত্ব।

ভেক্টর রাশি : ওজন, বল, বেগ, ত্বরণ, ভরবেগ, সরণ।

9. একক কাকে বলে ?

উত্তরঃ  কোনো ভৌত রাশি পরিমাপ করার ক্ষেত্রে, ওই ভৌত রাশির একটি সুবিধাজনক ও নির্দিষ্ট মানকে প্রমাণ ধরে, তুলনামূলকভাবে ওই ভৌত রাশির পরিমাপ করা হয়। ওই নির্দিষ্ট মানকে পরিমাপের একক বলা হয় ৷

10. এককের প্রয়োজনীয়তা কী ?

উত্তরঃ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় পরিমাপ উল্লেখ করা আবশ্যক। সেইজন্য কোনো ভৌত রাশির পরিমাপের ক্ষেত্রে এককের প্রয়োজন। কোনো ভৌত রাশিকে প্রকাশ করা হয় সাংখ্যমান ও এককের সাহায্যে। একক ছাড়া পরিমাপ সম্ভব নয়। বিভিন্ন ভৌতরাশির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন বা ভৌত রাশি সম্পর্কিত সমীকরণের সঠিকতা যাচাই-এর জন্যও এককের প্রয়োজন।

11. নির্দিষ্ট রাশি পরিমাপের জন্য একটি নির্দিষ্ট একক থাকা প্রয়োজন—একথা তুমি সমর্থন কর কি না তা উদাহরণসহ বুঝিয়ে দাও ?

উত্তরঃ  হ্যাঁ, নির্দিষ্ট রাশি পরিমাপের জন্য অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট একক থাকা প্রয়োজন।

উদাহরণস্বরূপ, ভাবা যেতে পারে দৈর্ঘ্য পরিমাপের প্রসঙ্গ। দৈর্ঘ্যের কোনো নির্দিষ্ট একক না থাকলে যে-কোনো দুটি জায়গা, যেমন কলকাতা থেকে দিল্লির দূরত্ব, এক-একজনের পরিমাপে এক-এক রকম হত। কিন্তু তুলনীয় কোনো দূরত্ব বুঝতে আমাদের খুব একটা অসুবিধা হয় না। যেমন, যদি কারও কলকাতা থেকে বর্ধমানের দূরত্ব সম্বন্ধে মোটামুটি একটা ধারণা থাকে, তবে কলকাতা থেকে দিল্লির দূরত্ব সেই দূরত্বের তুলনায় কতগুণ, তা বলা হলে, কলকাতা থেকে দিল্লির দূরত্ব সম্বন্ধে একটা ধারণা জন্মায়। এক্ষেত্রে কলকাতা থেকে বর্ধমানের দূরত্ব হল একক দূরত্ব। এইভাবে যে-কোনো রাশির পরিমাপের ক্ষেত্রেই একটি একক থাকা প্রয়োজন।

12. প্রাথমিক বা মৌলিক বা মূল একক কাকে বলে? 

উত্তরঃ  যে সমস্ত ভৌত রাশির একক পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল নয়, অর্থাৎ স্বাধীনভাবে গঠন করা হয়েছে এবং যাদের সাহায্যে অন্যান্য ভৌত রাশির একক গঠন করা যায়, সেই সমস্ত ভৌত রাশির এককগুলিকে মৌলিক একক বলা হয়।

13. SI-তে প্রাথমিক এককগুলি কী কী ?

উত্তরঃ  SI-তে দৈর্ঘ্য, ভর, সময়, তাপমাত্রা, তড়িৎপ্রবাহ, দীপন প্রাবল্য ও পদার্থের পরিমাণ—এই ভৌত রাশিগুলির মূল বা প্রাথমিক এককগুলি যথাক্রমে মিটার, কিলোগ্রাম, সেকেন্ড, কেলভিন, অ্যাম্পিয়ার, ক্যান্ডেলা ও মোল।

Important Notes:

 SI-তে সাতটি মূল একক ছাড়াও সমতল কোণ (plane angle) ও ঘনকোণ (solid angle) এই দুটি ভৌত রাশির একককে সম্পূরক একক (supplementary units) হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। সমতল কোণের একক হল রেডিয়ান (rad) ও ঘনকোণের একক হল স্টেরেডিয়ান (sr)। কিন্তু 1995 খ্রিস্টাব্দে এই দুটি একককে সম্পূরক এককের শ্রেণি থেকে বাদ দিয়ে লম্ব এককের শ্রেণিভুক্ত করা হয়।

14. দৈর্ঘ্য, ভর ও সময়ের একককে মৌলিক একক বলা হয় কেন ?

উত্তরঃ  দৈর্ঘ্য, ভর ও সময়ের একক হল মৌলিক একক, কারণ— 

  1.  দৈর্ঘ্য, ভর ও সময়ের একক পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল নয়, অর্থাৎ স্বাধীনভাবে গঠিত হয়।
  2. এই তিনটি ভৌত রাশির একককে বিশ্লেষণ করে সরলতর আকারে প্রকাশ করা যায় না।
  3. এই তিনটি ভৌত রাশির এককের সাহায্যে অন্যান্য ভৌত রাশির একক গঠন করা যায়।

 

15. লব্ধ একক কাকে বলে? উদাহরণসহ বুঝিয়ে দাও?

উত্তরঃ  যে সমস্ত ভৌত রাশির একক, এক বা একাধিক মূল এককের সাহায্যে গঠিত হয়, সেই সমস্ত ভৌত রাশির এককগুলিকে লব্ধ একক বলা হয়। যেমনবেগ, ত্বরণ, ভরবেগ, বল, কার্য প্রভৃতি রাশির একক হল লব্ধ একক

 উদাহরণ: বেগ হল কোনো বস্তুর সরণের হার। বেগের একক যে লম্ব একক তা নিম্নলিখিত পদ্ধতিতে বোঝা যায়।

বেগ=সরণ/সময়

বেগের একক =(সরণের একক)/(সময়ের একক)=(দৈর্ঘ্যের একক)/(সময়ের একক)

 সুতরাং, বেগের একক দৈর্ঘ্য ও সময় এই দুটি মৌলিক এককের সাহায্যে গঠিত, তাই এটি লক্ষ একক।

16. নীচের রাশিগুলির মধ্যে কোনটির একক মৌলিক ও কোনটির একক লব্ধ তা উল্লেখ করো: ক্ষেত্রফল, আয়তন, সরণ, বেগ, ত্বরণ, বল, কার্য, শক্তি, ক্ষমতা, ভরবেগ, ভর, ওজন, উচ্চতা, ঘনত্ব, তরঙ্গদৈর্ঘ্য, পর্যায়কাল।

উত্তরঃ  মৌলিক এককবিশিষ্ট রাশি: সরণ, ভর, উচ্চতা, তরঙ্গদৈর্ঘ্য,পর্যায়কাল।

লম্ব এককবিশিষ্ট রাশি: ক্ষেত্রফল, আয়তন, বেগ, ত্বরণ, বল, কার্য, শক্তি, ক্ষমতা, ভরবেগ, ওজন, ঘনত্ব ।

17.  দুটি মৌলিক একক দ্বারা গঠিত একটি লম্ব এককের উদাহরণ দাও?

উত্তরঃ   দুটি মৌলিক একক দ্বারা গঠিত একটি লব্ধ একক হল দ্রুতির একক।

দ্রুতির একক = (অতিক্রান্ত দূরত্বের একক)/(সময়ের একক)=(দৈর্ঘ্যের একক /সময়ের একক)

 দ্রুতির একক হল দৈর্ঘ্য ও সময় এই দুটি মৌলিক রাশির এককের সাহায্যে গঠিত একটি লম্ব একক।

 

  1. জীবন ও তার বৈচিত্র- ক্লাস ৯ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর—–> Click here

  2. জীবন ও তার বৈচিত্র্য প্রশ্ন উত্তর ক্লাস ৯——-> Click Here

  3. 3.গ্রহরুপে পৃথিবী– CLASS 9 SHORT Question

 

জীবন ও তার বৈচিত্র- ক্লাস ৯ সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর

জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী লেখো?

উত্তরঃ  

জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্যাবলিঃ

সজীব বস্তুর বহিঃপ্রকাশিত বৈশিষ্ট্যগুলিই ‘জীবন’রূপে চিহ্নিত হয়। এই সকল বৈশিষ্ট্য সজীব বস্তুকে জড়বস্তুর থেকে পৃথক করে। এখানে জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হল—।

  1. প্রজনন ও বংশবৃদ্ধিঃজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল জনন। প্রজননের মাধ্যমে কোনো জীব তার জীবনকালে নিজের মতো নতুন জীব সৃষ্টি করে বংশবৃদ্ধি ঘটায়। বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব বজায় থাকে।
  2. বিপাক: প্রতিটি জীবের বেঁচে থাকা ও বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ক্রিয়াকলাপের জন্য শক্তির প্রয়োজন হয়। শক্তি উৎপাদন ও শক্তি ব্যবহারের এই সমস্ত বিক্রিয়াগুলিকে একত্রে বিপাক বলে। যেমন—সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে শর্করাজাতীয় খাদ্য প্রস্তুত করে। সালোকসংশ্লেষ তাই সামগ্রিকভাবে একটি বিপাক পদ্ধতি।
  3. উত্তেজিতা: উত্তেজিতা জীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক উদ্দীপকের প্রভাবে জীবের সাড়া দেওয়াকে উত্তেজিতা বলা হয়। এই ধর্মের সাহায্যে জীবদেহে তাপ, চাপ, বেদনা প্রভৃতি অনুভূত হয়।যেমন—লজ্জাবতী লতার পাতা স্পর্শ করলে তা মুড়ে যায়।
  4. সংগঠন: প্রত্যেকটি জীবের দেহ একটি সুনির্দিষ্ট রীতিতে সংগঠিত হয়। সাধারণত কতকগুলি কোশ একত্রিত হয়ে কলা, কলা একত্রিত হয়ে অঙ্গ, অঙ্গ একত্রিত হয়ে তন্ত্র এবং অনেকগুলি তন্ত্র মিলে জীবদেহ গঠন করে।

       5. বদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ: জীবের আকার, আয়তন এবং শুষ্ক ওজন বেড়ে যাওয়াকে বৃদ্ধি বলে। স্থানীয় বৃদ্ধি জীবদেহের ক্ষয়পূরণে সাহায্য করে।

2. পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তি কীভাবে ঘটেছে তা সংক্ষেপে আলোচনা করো।

অথবা, জীবনের উৎপত্তি সম্বন্ধে ওপারিন এবং হ্যালডেন মতবাদ লেখো।

উত্তরঃ  পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তির সংক্ষিপ্ত আলোচনাঃ

পৃথিবীতে প্রাণ সৃষ্টি বা জীবনের উৎপত্তি কীভাবে ঘটেছে, এই বিষয়ে নানা মতবাদ প্রচলিত আছে। আলেকজান্ডার ওপারিন 1924 খ্রিস্টাব্দে তাঁর ‘The Origin of Life on Earth’ নামক গ্রন্থে জীবনের উৎপত্তি-সংক্রান্ত প্রকল্পটি প্রণয়ণ করেন। পরবর্তীকালে জে বি. এস. হ্যালডেন (1928) প্রাণের উৎপত্তি-সংক্রান্ত একইরকম মতবাদ প্রকাশ করেন। এই দুই বিজ্ঞানীর প্রস্তাবিত জীবনের উৎপত্তি সংক্রান্ত তত্ত্বই বর্তমানে সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য। এই তত্ত্বের নাম ‘জীবনের জৈবরাসায়নিক উৎপত্তির তত্ত্ব’ বা ‘অ্যাবায়োজেনেসিস তত্ত্ব’। জীবনের উৎপত্তির ওটি পর্যায় হল—

[1] পৃথিবীর উৎপত্তি ও তার প্রাচীন পরিবেশের ক্রমপরিবর্তন,

[2] জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বা কেমোজেনি,

[3] প্রাণের জৈবিক বিবর্তন বা বায়োজেনি।

প্রাণের উৎপত্তির এই পর্যায়গুলি নীচে আলোচনা করা হল।

  1. পৃথিবীর উৎপত্তি ও তার প্রাচীন পরিবেশের ক্রমপরিবর্তন:প্রায় 5-6 বিলিয়ন বছর পূর্বে প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে পৃথিবীর সৃষ্টি হয়। সৃষ্টির শুরুতে পৃথিবী ছিল এক উত্তপ্ত গ্যাসীয় পিণ্ড। কয়েকশো মিলিয়ন বছর ধরে গ্যাসগুলি ঘনীভূতহয় এবং বিভিন্ন স্তরে বিন্যস্ত হয়। সেই সময়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা ছিল প্রায় 5000 – 6000°C। এই অতি উচ্চ তাপমাত্রায় বিভিন্ন গ্যাস, যেমন—হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, মিথেন ইত্যাদির স্বাধীনভাবে অবস্থান করা অসম্ভব ছিল। তাই মৌলগুলি পরস্পরের সাথে অথবা কোনো ধাতু বা অধাতুর সাথে যুক্ত হয়ে অবস্থান করত। এর ফলে পরিবেশে কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, জলীয় বাষ্প ইত্যাদি থাকলেও মুক্ত অক্সিজেন উপস্থিত ছিল না। পৃথিবীর পরিবেশ ছিল বিজারক প্রকৃতির। ক্রমশ জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত সুরু হয়। এই জলচক্রের আবির্ভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা হ্রাস পায় ও কঠিন উপাদানের উৎপত্তি ঘটে। বৃষ্টিপাতের ফলে জলরাশি সঙ্কিত হয়ে সমুদ্রের উৎপত্তি ঘটে।

 

  1. জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি বা কেমোজেনিঃ জীবন সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য জৈব যৌগের উৎপত্তিকে বিজ্ঞানী ওপারিন ও হ্যালডেন কেমোজেনি বলে অভিহিত করেন। কেমোজেনির ধাপগুলি হল—

[A] সরল জৈব যৌগের উৎপত্তি: পৃথিবীর প্রাচীন পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে পৃথিবীর তাপমাত্রাও হ্রাস পেতে থাকে। পরিবেশে উপস্থিত বিভিন্ন যৌগগুলি (যেমন— হাইড্রোজেন, মিথেন, জলীয় বাষ্প) পরস্পর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে উত্তপ্ত বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে সরল জৈব যৌগ (যেমন—অ্যামিনো অ্যাসিড, সরল শর্করা, ফ্যাটি অ্যাসিড প্রভৃতি) গঠন করে। বজ্রবিদ্যুৎ, অতিবেগুনি রশ্মি, মহাজাগতিক রশ্মি এই বিক্রিয়ায় শক্তি জোগান দেয়।

[B] জটিল জৈব যৌগের উৎপত্তিঃ বিভিন্ন সরল যৌগগুলি ঘনীভবনের মাধ্যমে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, লিপিড, নিউক্লিক অ্যাসিড ইত্যাদির সৃষ্টি করে।

[C] কোয়াসারভেট-এর উৎপত্ত: আদিম পৃথিবীতে সমুদ্রের উত্তপ্ত জলে শর্করা, অ্যামিনো অ্যাসিড, প্রোটিন, লিপিড প্রভৃতি জৈব যৌগ যুক্ত হয়। বিজ্ঞানী হ্যালডেন একেই ‘তপ্ত লঘু স্যুপ’ (hot dilute soup) নামে অভিহিত করেন। এই তপ্ত লঘু স্যুপের জৈব যৌগগুলি পরস্পর সংযুক্ত হয়ে একপ্রকার বিভাজনে সক্ষম কোলয়েড গঠন করে। বিজ্ঞানী ওপারিন এর নাম দেন কোয়াসারভেট। ওপারিনের মতে কোয়াসারভেট অস্থায়ী আকৃতি ও আয়তনবিশিষ্ট গঠন। কিন্তু বিজ্ঞানী সিডনি ফক্স-এর মতে দ্বি-লিপিড পর্দাবৃত বিভাজন ক্ষমতাসম্পন্ন যে যৌগ থেকে প্রাণের উৎপত্তি হয়, তা নির্দিষ্ট আকার ও আয়তনবিশিষ্ট। বিজ্ঞানী ফক্স এর নাম দেন মাইক্রোস্ফিয়ার

  1. প্রাণের জৈবিক বিবর্তন বা বায়োজেনিঃকোয়াসারভেটগুলি আদিম সমুদ্র থেকে নিউক্লিক অ্যাসিড, প্রোটিন ইত্যাদি শোষণ করে। একাধিক কোয়াসারভেট পরস্পর মিলিত হয়ে বিপাকীয় ধর্মযুক্ত প্রোটোৰায়ন্ট গঠন করে। প্রোটোবায়ন্টগুলি রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে জৈব যৌগ গঠন করে। জৈব যৌগযুক্ত, প্রতিলিপির মাধ্যমে জননে সক্ষম রূপান্তরিত প্রোটোবায়ন্টগুলিকে ইয়োবায়ন্ট বা প্রোটোসেল বলে। এই প্রোটোসেলগুলি হল পৃথিবীতে সৃষ্ট প্রথম সঞ্জীব বস্তু। পরবর্তীকালে সাইটোপ্লাজমের উৎপত্তি হওয়ায় প্রোটোসেল থেকে আদি কোশ বা প্রোক্যারিওটিক কোশ সৃষ্টি হয়।

 3. জীববৈচিত্র্য কাকে বলে? জীববৈচিত্র্যের উৎস সম্বন্ধে আলোচনা করো?

উত্তরঃ  জীববৈচিত্র্য:

নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলে উপস্থিত বিভিন্ন প্রকারের জীবের আকৃতি, গঠন ও প্রকৃতির বিভিন্নতার বৈচিত্র্যকে জীববৈচিত্র্য বলে।

জীববৈচিত্র্যের উৎসঃ

বৈচিত্র্যময় পৃথিবীতে বর্তমান মোট জীবিত প্রজাতির সংখ্যা সঠিকভাবে ধারণা করা বেশ কঠিন। এখনও পর্যন্ত প্রায় 1.9 মিলিয়ন প্রজাতির সম্বন্ধে জানা গেছে। এর মধ্যে, বিভিন্ন অণুজীব, ছত্রাক, পতঙ্গ, গৃহপালিত পশুপাখি অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এদের প্রকৃত সংখ্যা সম্বন্ধে ধারণা করা কঠিন। বিজ্ঞানী টেরি আরউইন (1982)-এর মতে পৃথিবীতে উপস্থিত মোট প্রজাতির সংখ্যা প্রায় 30 মিলিয়ন। জীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল জনন। এর মাধ্যমে জনিতৃ জীব থেকে অপত্য জীব সৃষ্টি হয়। প্রত্যেক সজীব বস্তুই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখে একে অপরের থেকে কিছুটা হলেও ভিন্ন হয়। এই ভিন্নতার জন্য দায়ী হল জীবকোশে উপস্থিত বংশগতীয় বস্তু বা জিন। এই জিনগত বৈচিত্র্য বা বিভিন্নতার ফলে একই প্রজাতিভুক্ত বিভিন্ন জীবে কিংবা এক প্রজাতির সঙ্গে অন্য প্রজাতির মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়। এই জিনগত বৈচিত্র্য সম্ভব হয় জিনের গঠনগত পরিবর্তন বা পরিব্যক্তির মাধ্যমে, যার ফলে প্রকরণ দেখা যায়। এই প্রকরণগুলির জীবের এক জনু থেকে অপর জনুতে স্থানান্তরণ ঘটে। প্রকরণের উপস্থিতির দ্বারাই জীব নিজেদের পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে অভিযোজিত করে। যার ফলে, জীবের প্রাকৃতিক নির্বাচন ঘটে। এর ফলে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয় অর্থাৎ, জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। এর থেকে বলা যায় যে প্রকরণ হল জীববৈচিত্র্যের উৎস।

4. প্রকরণের বিভিন্ন প্রকারভেদ ও তাদের গুরুত্ব উল্লেখ করো?

উত্তরঃ  প্রকরণের প্রকারভেদঃ

কোনো জীব প্রজাতির অন্তর্গত একটি জীব থেকে অন্য জীবের বাহ্যিক গঠনগত পার্থক্যকে প্রকরণ বলে। প্রকরণ প্রধানত দুই প্রকার—

[1] অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ এবং 

[2] বিচ্ছিন্ন প্রকরণ। 

[1] অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ (Continuous variation) : একটি নির্দিষ্ট জীবগোষ্ঠীর বিভিন্ন জীবের মধ্যে যে ছোটো ছোটো ও ক্রমিক গুণগত পার্থক্য দেখা যায়, তাকে অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ বলে। অবিচ্ছিন্ন প্রকরণের ফলে জিনগত বৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয়।

>> উদাহরণ: দুটি মানুষের উচ্চতা, গায়ের রং, পায়ের দৈর্ঘ্য এগুলি সমান হয় না। তাই এগুলি অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ।

>> গুরুত্ব: অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ একই প্রজাতির বিভিন্ন জীবের মধ্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে। এই বৈচিত্র্যগুলির মধ্যে যেগুলির প্রাকৃতিক নির্বাচন ঘটে, সেই বৈচিত্র্যগুলিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।

 

[2]বিচ্ছিন্ন প্রকরণ (Discontinuous variation): কোনো নির্দিষ্ট জীবগোষ্ঠীর মধ্যে হঠাৎ কোনো বড়ো গঠন বিচ্যুতি দেখা দিলে, তাকে বিচ্ছিন্ন প্রকরণ বলে। বিচ্ছিন্ন প্রকরণের ফলে প্রজাতি বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়।

>> উদাহরণঃ মানুষের হাতে বা পায়ে চটি আঙুল। এটি হল বিচ্ছিন্ন প্রকরণের উদাহরণ।

>> গুরুত্ব: মিউটেশন বা পরিব্যক্তি হল বিচ্ছিন্ন প্রকরণ সৃষ্টির অন্যতম কারণ। পরিব্যক্তির ফলে দ্রুত নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয় অর্থাৎ, জীবের প্রজাতি বৈচিত্র্য সৃষ্টির অন্যতম কারণ হল বিচ্ছিন্ন প্রকরণ।

5. অবিচ্ছিন্ন ও বিচ্ছিন্ন প্রকরণের কারণগুলি উল্লেখ করো?

উত্তরঃ  অবিচ্ছিন্ন প্রকরণ সৃষ্টির মূল কারণগুলি হল— 

[1] ক্রোমোজোমের স্বাধীন সারণ এবং 

[2] জিনের ক্রসিং ওভার। 

[1] ক্রোমোজোমের স্বাধীন সঞ্চারণ: মিয়োসিস কোশ বিভাজনের সময়ে অ্যানাফেজ-1 ও অ্যানোফেজ দশায় পিতা – মাতার যে-কোনো ক্রোমোজোম স্বাধীনভাবে সারিত হয়। এর ফলে নতুন নতুন বৈচিত্র্য সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে।

[2 ] জিনের ক্রসিং ওভারঃ মিয়োসিস কোশ বিভাজনের সময়ে দুটি জিনের অ্যালিলের মধ্যে ক্রসিং ওভার (বা আদনপ্রদান ঘটে। এর ফলে নতুন জিন সমন্বয় তথা জিন বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়।

 

·  বিচ্ছিন্ন প্রকরণের মূল কারণ:

বিচ্ছিন্ন প্রকরণের মূল কারণ হল পরিব্যক্তি বা মিউটেশন। জিনের গঠনগত পরিবর্তন, ক্রোমোজোমের সংখ্যার পরিবর্তন ইত ফলে মিউটেশন বা পরিব্যক্তির সৃষ্টি হয়। এই পরিব্যক্তির ফলেই নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে।

 

  • জীব ও জড়ের পার্থক্যগুলি উল্লেখ করো?

পার্থক্যের বিষয়

জীব

জড়

উত্তেজিতা

জীব উত্তেজনায় সাড়া দেয়। জড় উত্তেজনায় সাড়া দেয় না।

প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি

প্রজননের দ্বারা জীব বংশবৃদ্ধি করতে পারে। জড় বংশবৃদ্ধি করতে পারে না।

পুষ্টি ও বৃদ্ধি

খাদ্যগ্রহণ করার ফলে জীবের পুষ্টি, বৃদ্ধি ইত্যাদি ঘটে। জড়বস্তু খাদ্যগ্রহণ করে না। তাই এদের পুষ্টি, বৃদ্ধি ইত্যাদি ঘটে না।

চলন-গমন

জীবের চলন, গমন আছে। জড়ের নিজস্ব চলন, গমন নেই।

শ্বাসকার্য

জীব শ্বাসকার্য করতে পারে। জড় শ্বাসকার্য করতে পারে না।

অভিযোজন

জীব পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। জড়ের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা নেই।

পরিব্যক্তি

জীবের দেহে পরিব্যক্তি ঘটে। জড়ের ক্ষেত্রে পরিব্যক্তি ঘটে না।

জীবনচক্র

জীবের জীবনচক্র আছে। জড়ের জীবনচক্র নেই।

জরা ও মৃত্যু

জীবের জরা ও মৃত্যু আছে। জড়ের জরা ও মৃত্যু নেই।

  • কোয়াসারভেট এবং মাইক্রোস্ফিয়ার এর পার্থক্য লেখো?

তুলনার বিষয়

কোয়াসারভেট

মাইক্রোস্ফিয়ার

সংজ্ঞা

‘তপ্ত লঘু স্যুপে’ উৎপন্ন পর্দাবৃত বিন্দু। সমুদ্রের জলে সৃষ্ট দ্বি-লিপিড পর্দাবৃত বিন্দু।

বিভাজন ক্ষমতা

বিভাজন ক্ষমতাবিহীন। বিভাজন ক্ষমতাসম্পন্ন।

ভূমিকা

প্রোটোসেল উৎপাদনের পূর্বগঠন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রোটোসেল উৎপাদন ক্ষমতাযুক্ত এবং আদি কোশের পূর্বগঠন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

গঠনগত উপাদান

প্রোটিন, ফ্যাট, শর্করা, নিউক্লিক  অ্যাসিড। প্রোটিনয়েড থেকে উৎপন্ন প্রোটিন ও অন্য জৈব যৌগ।

 

  • কোয়াসারভেট এবং প্রোটোসেল-এর তুলনা করো ?

তুলনার বিষয়

কোয়াসারভেট

প্রোটোসেল

গঠন

জৈব যৌগ সংবলিত, সীমানাপর্দাবৃত বিন্দু, যা থেকে আদি কোশ সৃষ্টি হয়। প্রোক্যারিওটিক, জেনেটিক উপাদানবিশিষ্ট (RNA), অবায়ুজীবী প্রাণ।

বিভাজন ক্ষমতা

বিভাজন ক্ষমতাবিহীন। বিভাজন ক্ষমতাসম্পন্ন।

বৈশিষ্ট্য

জীবন সৃষ্টির ক্ষমতাসম্পন্ন, জৈব পদার্থপূর্ণ গঠন। কোশপর্দাযুক্ত, জৈব পদার্থপূর্ণ পৃথিবীর প্রথম প্রাণ।